দেশের শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। ব্যাংক খাতে জোরালো ক্রয়চাপের ওপর ভর করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)–এর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স টানা ষষ্ঠ সপ্তাহের মতো ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে লেনদেন শেষ করেছে। নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে উন্নতির আভাস বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)–এর শীর্ষ নেতৃত্বে সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রত্যাশাও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে। ডিএসইর পরিচালক মো. সাজেদুল ইসলাম বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে বড় ধরনের পরিবর্তন এলে বাজারে আস্থা আরও দৃঢ় হতে পারে। তাঁর মতে, অনেক বিনিয়োগকারীর ধারণা—বর্তমান নেতৃত্ব বাজারে শৃঙ্খলা ও বিশ্বাস পুরোপুরি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নীতিগত পরিবর্তনের ইতিবাচক বার্তা
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতোমধ্যে বাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এদিকে সরকার ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমান–কে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ব্যাংক–এর গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
এক বিশ্লেষণে ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ জানিয়েছে, ‘বিজনেস-ফার্স্ট’ মানসিকতার এই নিয়োগ স্বল্পমেয়াদে শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের মতে, বড় করপোরেট ঋণ ব্যাংকের ব্যালান্স শিট থেকে শেয়ারবাজারে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলে ব্যাংক খাতে ঝুঁকি কমবে এবং পুঁজিবাজার আরও শক্ত ভিত্তি পাবে।
ব্যাংক খাতেই বাজারের চালিকাশক্তি
সপ্তাহজুড়ে ব্যাংক খাতই বাজারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নত অর্থনৈতিক পরিবেশে ব্যাংকগুলোর আয় বাড়বে। পাশাপাশি ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক শিথিলতাও ব্যাংক শেয়ারের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে।
পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার দিন সূচক বেড়েছে এবং এক দিন সামান্য সংশোধন হয়েছে। সপ্তাহ শেষে ডিএসইএক্স সূচক ১৩৪ পয়েন্ট বা ২.৪৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫,৬০০ পয়েন্টে। টানা ছয় সপ্তাহে সূচকটি মোট ৫৮১ পয়েন্ট বেড়েছে।
একই সময়ে বাজারমূলধন ৩৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকায়।
অন্যান্য সূচক ও শেয়ারের অবদান
ব্লু-চিপ ডিএস৩০ সূচক ৭২ পয়েন্ট বেড়ে ২,১৬৯ পয়েন্টে এবং শরিয়াভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ২১ পয়েন্ট বেড়ে ১,১১৬ পয়েন্টে বন্ধ হয়েছে।
ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, বেক্সিমকো ফার্মা, ইস্টার্ন ব্যাংক এবং রবি আজিয়াটা—এই পাঁচ শেয়ারের দরবৃদ্ধি মিলিয়ে ডিএসইএক্সে ৫৮ পয়েন্ট যোগ হয়েছে।
এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক একাই ১৯ পয়েন্টের বেশি অবদান রেখেছে; সপ্তাহজুড়ে শেয়ারটির দর বেড়েছে ৪.৮ শতাংশ। সিটি ব্যাংক যোগ করেছে ১৭.১ পয়েন্ট।
লেনদেন কমলেও বাজারে অংশগ্রহণ শক্ত
তবে সূচক বৃদ্ধির বিপরীতে লেনদেন কিছুটা কমেছে। সপ্তাহে মোট লেনদেন হয়েছে ৩ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা, যেখানে আগের সপ্তাহে ছিল ৫ হাজার ২৫০ কোটি টাকা।
গড় দৈনিক লেনদেন দাঁড়িয়েছে ৭২৫ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ৩১ শতাংশ কম।
ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৮৯টি কোম্পানির মধ্যে
দর বেড়েছে ২৭৪টির,
কমেছে ৮৩টির,
অপরিবর্তিত ছিল ৩২টি শেয়ারের।
খাতভিত্তিকভাবে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত সর্বোচ্চ ৫.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। এছাড়া ব্যাংকিং, ফার্মা, টেলিকম, প্রকৌশল, বিদ্যুৎ ও খাদ্য খাতেও ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
দুই বাজারেই ঊর্ধ্বমুখী ধারা
সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে সিটি ব্যাংকের শেয়ার, যার লেনদেনমূল্য ছিল ২২৬ কোটি টাকা। এরপর ছিল অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, ব্র্যাক ব্যাংক ও রবি আজিয়াটা।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)–এও ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় ছিল।
সিএএসপিআই সূচক ২৪৮ পয়েন্ট বেড়ে ১৫,৫৯৭ পয়েন্টে,
সিএসসিএক্স সূচক ১৫৮ পয়েন্ট বেড়ে ৯,৫৮৭ পয়েন্টে সপ্তাহ শেষ করেছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রত্যাশা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত শিথিলতা এবং ব্যাংক খাতে আস্থার পুনরুদ্ধার—সব মিলিয়ে শেয়ারবাজারে আবারও আস্থার আলো দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
























