ঢাকা   বৃহস্পতিবার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

২০০ গুণ পিই, এনএভি মাত্র ১৬ টাকা—ওরিয়ন ইনফিউশনে বড় ঝুঁকির অ্যালার্ম

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:৫১, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ১০:১৮, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

২০০ গুণ পিই, এনএভি মাত্র ১৬ টাকা—ওরিয়ন ইনফিউশনে বড় ঝুঁকির অ্যালার্ম

পুঁজিবাজারে ওষুধ ও রসায়ন খাতের এই কোম্পানিটিকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ এখন আর গুজব নয়—পরিসংখ্যানই দিচ্ছে বিপদের স্পষ্ট সংকেত। মুনাফা কমছে, সম্পদমূল্য দুর্বল, স্বল্পমেয়াদি ঋণের চাপ বাড়ছে—অথচ শেয়ারদর ছুটছে লাগামহীন গতিতে। এই বৈপরীত্যই ওরিয়ন ইনফিউশনের শেয়ারকে ঠেলে দিয়েছে উচ্চঝুঁকির রেড জোনে।

আয় কমছে, কিন্তু দাম বাড়ছে—বিস্ময়কর উল্টোচিত্র

২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলমান কার্যক্রম থেকে আয়ের (ইপিএস) ধারাবাহিকতা থাকলেও সর্বশেষ বছরে বড় ধাক্কা লেগেছে।

২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ২.০৮ টাকা, যা ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ১.৭২ টাকায়—এক বছরে প্রায় ১৭ শতাংশ আয় হ্রাস। স্বাভাবিক বাজার আচরণে এমন আয় কমলে শেয়ারদরও কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে সম্পূর্ণ উল্টো।

২০০ গুণ পিই—ঝুঁকির স্পষ্ট সাইরেন

২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারদর উঠে দাঁড়িয়েছে ৩৭০ টাকা। এর বিপরীতে ট্রেইলিং পিই অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২০০ গুণেরও বেশি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে যেখানে ৩০–৪০ গুণ পিই-ই অনেক ক্ষেত্রে অতিমূল্যায়িত বলে বিবেচিত হয়, সেখানে ২০০ গুণ পিই বিনিয়োগকারীদের জন্য সরাসরি ঝুঁকির সাইরেন।

এনএভি মাত্র ১৬ টাকা, বাজারদর ৩৭০!

আরও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে সম্পদমূল্যে। ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত হিসাবে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) মাত্র ১৬.০২ টাকা। অর্থাৎ বাজারদর বুক ভ্যালুর প্রায় ২৩ গুণ।

এ ধরনের ব্যবধান সাধারণত দ্রুত প্রবৃদ্ধিশীল বা শক্তিশালী বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে দেখা গেলেও, ওরিয়ন ইনফিউশনের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধির চিত্র সে মানদণ্ডে পড়ে না।

স্বল্পমেয়াদি ঋণের পাহাড়, রিজার্ভ দুর্বল

ঋণ কাঠামোও আশ্বস্ত করার মতো নয়। কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদি ঋণ ৩০৫.৭৪ মিলিয়ন টাকা, বিপরীতে রিজার্ভ ও উদ্বৃত্ত মাত্র ১২২.৫০ মিলিয়ন টাকা।
দীর্ঘমেয়াদি ঋণ না থাকলেও এত উচ্চ স্বল্পমেয়াদি দায় ভবিষ্যতে নগদ প্রবাহে তীব্র চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আয় কমার এই বাস্তবতায় ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।

আয় কমলেও লভ্যাংশ—টেকসই তো?

২০২৫ সালে কোম্পানি ২০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, যদিও একই বছরে মুনাফা কমেছে। অতীতে ১০, ১২ ও ২০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দেওয়া হলেও আয় সংকোচনের মধ্যেও উচ্চ লভ্যাংশ দেওয়া কতটা টেকসই—তা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংশয় বাড়ছে।

ফ্রি-ফ্লোট বেশি, অস্থিরতার ঝুঁকি তীব্র

শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো অনুযায়ী, স্পন্সর ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে প্রায় ৪০.৬১ শতাংশ শেয়ার। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৪৬ শতাংশের বেশি শেয়ার।

বাজারে উল্লেখযোগ্য ফ্রি-ফ্লোট থাকায় দামের অস্বাভাবিক ওঠানামা ও কারসাজির ঝুঁকিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা

সব মিলিয়ে ওরিয়ন ইনফিউশন লিমিটেডের আর্থিক চিত্রে এক ভয়ংকর বৈপরীত্য স্পষ্ট—
মুনাফা কমছে, সম্পদভিত্তি দুর্বল, ঋণের চাপ বেশি—কিন্তু শেয়ারদর আকাশচুম্বী।

উচ্চ পিই, কম এনএভি, বেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণ এবং আয় হ্রাস—এই চারটি সূচক একসঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় সতর্কবার্তা।

বাজার বিশ্লেষকদের ভাষায়, শেয়ারদরের উল্লম্ফন সবসময় কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক শক্তির প্রতিফলন নয়। তাই বিনিয়োগের আগে আবেগ নয়, হিসাবই হোক সিদ্ধান্তের ভিত্তি—এমনই পরামর্শ তাদের।

কোম্পানির বক্তব্য নেই

এ বিষয়ে জানতে কোম্পানির সেক্রেটারি নাজনীন নাহার রাখির মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে এসএমএস পাঠিয়েও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।