
বিভিন্ন দেশের বড় শহরগুলোর নাগরিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জাপানের নজর থাকে মূলত মেট্রোরেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর। বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোতে মেট্রোরেল নির্মাণে বিনিয়োগ করেছে জাপান। তেমনি বাংলাদেশেও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে এমআরটি লাইন-১ বা বাংলাদেশের প্রথম পাতাল রেল। যা ২০৩০ সালে এটি চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী দিনে দেশের অন্যান্য বড় শহরে মেট্রোরেল নির্মাণের ব্যাপারে পরিকল্পনা গ্রহণ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এতে নগর জীবনে স্বাচ্ছন্দ আসবে বা যাতায়াতে প্রচুর সময় বাঁচাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাতাল রেল চালু হলে অল্প সময়ে অধিক সংখ্যায় যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে। ছোট যানবাহনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় কমবে। জীবাশ্ম ও তরল জ্বালানির ব্যবহার কম হবে। যানজট অনেক কমবে। ঢাকা মহানগরীর জীবনযাত্রায় ভিন্ন মাত্রা ও গতি যোগ হবে। মহানগরবাসীর কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হবে। সাশ্রয়কৃত কর্মঘণ্টা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যবহার করা যাবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিকভাবে তিন রুটে চলাচল করবে এমআরটি লাইন-১ বা বাংলাদেশের প্রথম পাতাল রেল। আগামী ২০৩০ সালে এটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চালু হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর যেতে পারবে। এমআরটি লাইন-১ আন্ডার গ্রাউন্ড প্যাকেজ সিপি-০৪ (রামপুরা-নতুন বাজার), সিপি-০৫ (নতুনবাজার-নর্দ্দা), সিপি-০৬ (নর্দ্দা-বিমানবন্দর)।
ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-১) সূত্র জানায়, প্রকল্পের সর্বমোট ১২টি প্যাকেজের মধ্যে ইতোমধ্যে ৯টির দরপত্র দাখিল হয়েছে, যার মধ্যে একটি প্যাকেজের নির্মাণকাজ প্রায় সমাপ্ত। অপর ৭টি প্যাকেজের আর্থিক দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং ১টি প্যাকেজের (সিপি-০৮) কারিগরি মূল্যায়ন চলমান রয়েছে। সামগ্রিকভাবে দর দাতাগণের উদ্ধৃত দর ডিপিপি মূল্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৯,৪৫০ দশমিক ৩২ কোটি টাকা হতে বৃদ্ধি পেয়ে বাস্তবায়নাধীন একটি প্যাকেজের চুক্তি মূল্য, ৭টি প্যাকেজের উদ্ধৃত দর ও ৪টি প্যাকেজ বিবেচনায় ৭৫,৬৪৯ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। প্রতি কিলোমিটার টানেল নির্মাণ ব্যয় ১২৫০ দশমিক ৭২ কোটি টাকা হতে বৃদ্ধি পেয়ে ২৩৯৮ দশমিক ৩৬ কোটি টাকা হতে পারে।
তারা আরো জানায়, শিল্ড টানেল সেগমেন্ট থেকে পানি লিকেজ এড়াতে সেগমেন্টাল লাইনিং (আস্তরণ) থেকে পানি লিকেজজনিত দুর্ঘটনা এড়াতে টানেল সেগমেন্ট স্থাপনের সময়ে বিশেষ করে দুটো সেগমেন্টের সংযোগস্থলে সেগমেন্টাল লাইনিং এর গুণগত মান সুনিশ্চিত করতে এবং শিল্ড টানেল সেগমেন্টের পৃষ্ঠতলে কোনরকম কোন ফাটল দৃশ্যমান না হওয়ার জন্য পানি নিরোধক জাপানি বিশেষ প্রযুক্তি ‘ওয়ান পাস জয়েন্ট’ ব্যবহার করা হবে। বালু নদীর উপর তিন স্প্যান বিশিষ্ট সেতুটি ১৪৯ মিটার দীর্ঘ এবং সেতু সংলগ্ন একটি আন্ডারপাস রয়েছে। সেতুটি অক্ষুন্ন রেখে তার উপর দিয়ে যথাযথ নির্মাণের সুবিধায় ১৭২ মিটার দীর্ঘ একক স্প্যান বিশিষ্ট সেতুর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ সিপি-০৮ এর দরপত্র দলিলে ১৭২ মিটার দীর্ঘ একক স্প্যান বিশিষ্ট সেতুর প্রস্তাব রয়েছে। এত ব্যবহার করা হবে বিশেষভাবে উন্নতকৃত উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন ইস্পাত। জাপানের বাইরে কোনো ইস্পাত উৎপাদককে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
প্যাকেজ সিপি-০৮ এর প্রিকোয়ালিফিকেশন সম্পন্ন হয়েছে যাতে চীন, জাপান, কোরিয়া, ভারত ও বাংলাদেশের মোট ৮টি প্রতিষ্ঠান উত্তীর্ণ হয়। পরবর্তীতে চীন-বাংলাদেশ, জাপান-বাংলাদেশ এবং জাপান- কোরিয়ার ৩টি প্রতিষ্ঠানে মূল দরপত্র দাখিল করে। বর্তমানে কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ সিপি-০৮ এর কারিগরি মূল্যায়ন চলমান রয়েছে। কারিগরি মূল্যায়ন শেষে শুধুমাত্র উত্তীর্ণ দরদাতাগণের আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্ত করা হবে।
সম্প্রতি ভারতের ও অন্যান্য দেশের প্রকল্পগুলোর সাথে তুলনা করে ঢাকার মেট্রো রেল নির্মাণ প্রকল্পকে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রকল্পের পরিসর, নগরের ঘনত্ব, ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি এবং মুদ্রাস্ফীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিবেচনায় আনলে, ঢাকায় আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল নির্মাণ ব্যয় বিশ্বের অন্যান্য সমতুল্য মেট্রো ব্যবস্থার তুলনায় সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও তারা জানায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, টানেলিং প্রযুক্তি, বিশেষায়িত সিস্টেম এবং সংশ্লিষ্ট নির্মাণ দক্ষতা প্রথমবারের মতো দেশে আনতে বড় অংকের প্রাথমিক মোবিলাইজেশন ব্যয়ের প্রয়োজন হবে। ঢাকার নরম মাটি, উচ্চ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং বন্যা-ঝুঁকি প্রকৌশলগতভাবে মোকাবেলার প্রয়োজনে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এমআরটি লাইন-১ এর ডিজাইনে অগ্নি নিরাপত্তা, বন্যা প্রতিরোধ, জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোরসহ উন্নত বিশ্বমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশি টাকা ডলারের তুলনায় প্রায় ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ অবমূল্যায়িত হয়েছে। আমদানিকৃত পণ্যের ও বৈদেশিক মুদ্রায় চুক্তিভিত্তিক ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মেট্রো রেলের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, রোলিং স্টক, সিগন্যালিং সিস্টেম এবং নির্মাণসামগ্রী বাংলাদেশে উৎপাদিত না হওয়ায়, বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। এর ফলে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক দরপত্রে ব্যবহৃত মার্কিন ডলার ও জাপানি ইয়েনের বিপরীতে টাকার দুর্বলতা ব্যয় আরও বাড়িয়েছে। এমআরটি-১ এর আন্ডারগ্রাউন্ড অংশের ব্যয় প্রতি কিলোমিটারে ১৯৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা সিঙ্গাপুর, সিডনি এবং মেলবোর্নের তুলনায় কম। ঢাকার প্রকৌশল ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় প্রতি কিলোমিটারে ১৯৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় যৌক্তিক ও আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী তুলনাযোগ্য। ঢাকার আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো ভবিষ্যৎমুখী এবং জনগণের জন্য নিরাপদ সেবা নিশ্চিতে নির্মিত প্রকল্প বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (লাইন-১) প্রকল্প পরিচালক মো. আবুল কাসেম ভূঁঞা বলেন, প্রকল্পটির অর্থায়নে রয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা)। ২০১৫ সালে প্রণীত আরএসটিপি (রিভাইজড স্ট্রাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান) অনুসরণ করে এমআরটি লাইন-১ এর রুট এলাইনমেন্ট নির্ধারণ করে ২০১৭-১৮ সালে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়। জাইকার সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় আন্তর্জাতিক মান ও রীতিনীতি, দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং ঢাকায় অবকাঠামো নির্মাণ উপযোগিতার বিষয়গুলো বিবেচনা করে এমআরটি লাইন-১ এর উড়াল এবং পাতাল পথ চূড়ান্ত করা হয়। ১৯ দশমিক ৮৭২ কি.মি দীর্ঘ পাতাল এবং ১১ দশমিক ৩৬৯ কি.মি উড়াল মেট্রোরেলসহ মোট ৩১ দশমিক ২৪১ কি.মি দৈর্ঘ্যরে এলাইনমেন্টের মধ্যে ১২টি পাতাল ও ৭টি উড়াল স্টেশন থকবে।
তিনি আরো বলেন, দেশের বৃহত্তর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গণপরিবহনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রাখবে। যানজটে নষ্ট হওয়া লাখ লাখ কর্মঘণ্টার আর্থিক মূল্যে নির্ণয়পূর্বক বিবেচিত হতে পারে। জনবহুল ঢাকা ও অন্যান্য নগরে সড়কপথে গন্তব্যে পৌছানোর ভ্রমণ সময়ের অনিশ্চয়তাকে মেট্রোরেল ইতিবাচক ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে। পরিবেশ দূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে তা নগর পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে। উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামো জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। উন্নয়নসহযোগী ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিকট ইতিবাচক ভাব মর্যাদা রাখতে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখবে।