একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংকের প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারী এখন চরম অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক লেনদেন করতে না পারা এবং আমানতের মুনাফা কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে তাদের আর্থিক সংকট আরও গভীর হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের একজন এক্সিম ব্যাংকের আমানতকারী মেহনাজ বেগম। কথার শুরুতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, অবসরকালীন সঞ্চয় হিসেবে একটি ফিক্সড ডিপোজিটে টাকা রেখেছিলেন। কিন্তু প্রয়োজনের সময় সেই টাকা তুলতে না পারায় তিনি বিপাকে পড়েছেন।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক আফজালুল হক। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রেখে তিনি সেখানে আমানত রেখেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে স্বাভাবিকভাবে টাকা তুলতে না পারায় তিনি আর্থিকভাবে সংকটে পড়েছেন।
একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংক হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। এসব ব্যাংককে একত্র করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ নামে নতুন একটি ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য আমানতের ওপর ৪ শতাংশ হারে মুনাফা দেওয়া হবে। অথচ অনেক আমানতকারী ১২ থেকে ১৪ শতাংশ মুনাফার চুক্তিতে অর্থ জমা রেখেছিলেন। ‘হেয়ার কাট’ নামে মুনাফার একটি অংশ কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্তে আমানতকারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আমানতকারীরা মানববন্ধনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। তাদের দাবি, ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতির দায় সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চাপানো ঠিক নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার আমানত রয়েছে। অন্যদিকে ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় একটি অংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের পক্ষ থেকে নতুন ব্যাংকের মূলধন জোগানে ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকটির আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, একীভূত ব্যাংকের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
তবে এর আগে সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। এ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ব্যাংকের ক্ষতির দায় আমানতকারীদের ওপর চাপানো নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি মুনাফা কমানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট দায়েরের উদ্যোগ নিয়েছেন কয়েকটি ব্যাংকের উদ্যোক্তারা। তাদের দাবি, প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত হওয়া উচিত ছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আমানতকারীরা দ্রুত সমাধান চান। তাদের দাবি, ব্যাংকে স্বাভাবিক লেনদেন চালু করা এবং আমানতের অর্থ ও মুনাফা সুরক্ষিত রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
























