ঢাকা   বৃহস্পতিবার ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বহুল প্রত্যাশিত বিএসইসির চেয়ারম্যানসহ চার কমিশনারের পদত্যাগ

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩:০১, ৪ জুন ২০২৬

আপডেট: ১৩:০৫, ৪ জুন ২০২৬

বহুল প্রত্যাশিত বিএসইসির চেয়ারম্যানসহ চার কমিশনারের পদত্যাগ

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ চার কমিশনার পদত্যাগ করেছেন। কমিশনাররা হলেন- মু. মোহসীন চৌধুরী, মো. আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ ও মো. সাইফুদ্দিন।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পদত্যাগপত্র জমা দেন তারা।

খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট ৪ বছরের জন্য বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান। কমিশনার হিসেবে একই বছরের ২ জুন মু. মোহসীন চৌধুরী, ২৮ আগস্ট মো. আলী আকবর, ৩ সেপ্টেম্বর ফারজানা লালারুখ নিয়োগ পান। সবশেষ ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই কমিশনার হন মো. সাইফুদ্দিন।

আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে দেশের শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করা হবে বলে ঘোষণা দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে নেওয়া পদক্ষেপের বিবরণ দিয়ে বিদায় নিলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব পালন শেষে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। পদত্যাগ উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, গত ২১ মাস ধরে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি এখন ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও কর্মকাণ্ডে মনোযোগ দেওয়ার জন্য সরকারি এই পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।বাংলাদেশ সংবাদ

বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান কমিশন দেশের শেয়ারবাজারের অত্যন্ত অস্থির ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বাজারের আইনি কাঠামো সংস্কার এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কার্যক্রম শুরু করা হয়।

তিনি জানান, স্বল্প সময়ের মধ্যেই কমিশন পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে। এগুলো হলো— মার্জিন, আইপিও, মিউচুয়াল ফান্ড, ডেট সিকিউরিটিজ এবং হুইসেলব্লোয়ার সংক্রান্ত বিধিমালা। পাশাপাশি সম্প্রতি করপোরেট গভর্ন্যান্স, অডিট এবং করপোরেট পুনর্গঠন বিষয়ে তিনটি খসড়া বিধিমালা ও নির্দেশিকা জনমত গ্রহণের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে।

খন্দকার রাশেদ মাকসুদ আরও বলেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন এবং ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড আইন—এই দুটি নতুন আইনের খসড়াও প্রস্তুত করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের (এফআইডি) কাছে প্রণয়নের জন্য পাঠানো হয়েছে।

বাজারে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কমপ্লায়েন্স ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রমে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও তিনি তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কমিশন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সব ধরনের হস্তক্ষেপমূলক ব্যবস্থা অপসারণ করেছে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাজার, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ও ইস্যুয়ারদের স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে নিয়মিত অংশীজন সম্পৃক্ততা কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে।

বিনিয়োগকারী সচেতনতা ও শিক্ষা কার্যক্রমেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেন তিনি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং প্রশাসনের তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে এ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে বলে জানান তিনি।বাজার গবেষণা

চেয়ারম্যান বলেন, এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে বিএসইসির নবউদ্যমী ও পুনর্গঠিত একটি কর্মদলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। তাঁর মতে, কমিশনের এই দল ভবিষ্যতে আরও বড় অবদান রাখতে প্রস্তুত এবং আগ্রহী।


বার্তার শেষাংশে তিনি বলেন, বর্তমান কমিশন দেশের পুঁজিবাজারে একটি দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব রেখে যেতে পেরে গর্বিত। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনকালে সহযোগিতা ও সমর্থন দেওয়ার জন্য সহকর্মী, অংশীজন এবং সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

বিশ্লেষণ:

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে বড় সংকট ছিল—আস্থার সংকট। বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ মনে করতেন, বাজারে নীতির ধারাবাহিকতা নেই, নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন-এর চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ চার কমিশনারের পদত্যাগ এবং নতুন কমিশন পুনর্গঠনের ঘোষণা বাজারে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

এই পরিবর্তনকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি পুঁজিবাজারে “রিসেট” বা নতুন করে আস্থা ফেরানোর সুযোগ তৈরি করেছে। কারণ, বিশ্বজুড়ে দেখা গেছে—যখন কোনো বাজার দীর্ঘসময় দুর্বল থাকে, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পরিবর্তন অনেক সময় বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন কমিশন যদি শক্তিশালী ও বিনিয়োগবান্ধব সংস্কার কার্যক্রম চালু করতে পারে, তাহলে বাজারে স্থবিরতা কাটতে শুরু করবে। বিশেষ করে বিদেশি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা ও স্বাধীনতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।

উদাহরণ হিসেবে ভারতের বাজারের কথা বলা যায়। ১৯৯০-এর দশকে শেয়ারবাজারে বড় কেলেঙ্কারির পর Securities and Exchange Board of India (SEBI) শক্তিশালী সংস্কার কার্যক্রম নেয়। অনলাইন ট্রেডিং, কঠোর নজরদারি, ইনসাইডার ট্রেডিং দমন ও করপোরেট গভর্ন্যান্স জোরদারের মাধ্যমে ভারতের বাজারে আস্থা ফিরে আসে। ফলাফল হিসেবে দেশটির পুঁজিবাজারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। যদি নতুন বিএসইসি—

দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়,
কারসাজি ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়,
আইপিও অনুমোদনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে,
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করে,
এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখে,

তাহলে বাজারে ধীরে ধীরে আস্থা ফিরবে।

খন্দকার রাশেদ মাকসুদের বিদায়ী বক্তব্যেও বাজার সংস্কারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, গত ২১ মাসে কমিশন মার্জিন, আইপিও, মিউচুয়াল ফান্ড, ডেট সিকিউরিটিজ ও হুইসেলব্লোয়ার সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। এছাড়া করপোরেট গভর্ন্যান্স, অডিট ও করপোরেট পুনর্গঠন নিয়ে নতুন খসড়াও তৈরি হয়েছে।

এগুলো বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘমেয়াদে বাজারের ভিত্তি শক্তিশালী হতে পারত। তবে বাজারের অনেক অংশীজনের মতে, নীতিমালা প্রণয়ন হলেও তার বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করেছেন, বাজারে বড় কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কমই দেখা গেছে। ফলে কাগুজে সংস্কারের চেয়ে কার্যকর প্রয়োগই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে বাজারে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন “বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব”। কারণ পুঁজিবাজার মূলত মনস্তাত্ত্বিক একটি বাজার। বিনিয়োগকারীরা যখন মনে করেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা শক্ত হাতে বাজার তদারকি করছে, তখন তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হন। অন্যদিকে অনিশ্চয়তা ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণ থাকলে বাজারে বিক্রির চাপ বাড়ে।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বিএসইসি পুনর্গঠনের ঘোষণা দেওয়ায় বাজারে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে। কারণ বিনিয়োগকারীরা এখন নতুন নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে আছেন—যারা বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না, সেটিই হবে মূল প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কমিশন যদি দ্রুত কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়—যেমন:

কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা,
দুর্বল কোম্পানির পুনর্গঠন,
তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন কঠোরভাবে যাচাই,
বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব নীতি,
এবং বাজারে অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ রাখা,

তাহলে বাজারে লেনদেন বাড়বে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ফিরে আসবে এবং দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা কাটতে শুরু করবে।

সব মিলিয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগ বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা। এটি একদিকে যেমন পূর্ববর্তী সময়ের কার্যক্রমের মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে বাজারকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করার সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে—নতুন কমিশন কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে আস্থা পুনর্গঠনের কাজ শুরু করতে পারে।