শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোম্পানি এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন পিএলসিকে ঘিরে একের পর এক প্রশ্ন সামনে আসছে। সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোম্পানিটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যতটা দুর্বল, কাগজে-কলমে তা ততটাই শক্তিশালী দেখানোর চেষ্টা রয়েছে। টানা লোকসান, ঋণের ভার, সম্পদ পুনর্মূল্যায়নের ওপর নির্ভরতা এবং অস্বাভাবিক শেয়ারদর উত্থান—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগজনক।
২০২৩ সাল থেকেই কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফল অবনতির ধারায়। ২০২৩ সালে প্রায় ৪৪৮ মিলিয়ন টাকা লোকসানের পর ২০২৪ সালে সেই লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯৮৪ মিলিয়ন টাকায়। ২০২৫ অর্থবছরে লোকসান আরও বাড়িয়ে প্রায় ১ হাজার ৪৭ মিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। এই ধারাবাহিক ক্ষতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএসে। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ঋণাত্মক ৫ দশমিক ৫০ টাকা। শুধু প্রথমার্ধেই ইপিএস ঋণাত্মক ৬ দশমিক ৭৩ টাকা—যা ইঙ্গিত দেয়, লোকসান থামার কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ আপাতত নেই।
তবে লোকসানের এই বাস্তবতার বিপরীতে কোম্পানির রিজার্ভ ও উদ্বৃত্ত দেখানো হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩৪২ মিলিয়ন টাকা। এখানেই দেখা যায় বড় ধরনের হিসাবগত প্রশ্ন। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, রিজার্ভের বড় অংশই এসেছে সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন থেকে। জমি ও স্থায়ী সম্পদের মূল্য কাগজে বাড়িয়ে ‘রিভ্যালুয়েশন রিজার্ভ’ হিসেবে যে অঙ্ক যোগ করা হয়েছে, তা প্রকৃত নগদ প্রবাহ বা মুনাফা নয়। ফলে আর্থিক বিবরণীতে শক্ত অবস্থানের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে তার ভিত্তি বেশ নড়বড়ে।
শেয়ারপ্রতি সম্পদ মূল্য বা এনএভির চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২১ সালে যেখানে এনএভি ছিল প্রায় ৫৭ দশমিক ৭২ টাকা, ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৩২ দশমিক ৮৬ টাকায়। চার বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪৩ শতাংশ কমে যাওয়া স্পষ্টভাবে দেখায় যে, ধারাবাহিক লোকসান কোম্পানির ইকুইটি ভিত্তিকে ক্ষয় করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল ঋণের চাপ। ২০২৫ সালের জুন শেষে কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদি ঋণ ছিল প্রায় ২ হাজার ৮০৫ মিলিয়ন টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রায় ১০ হাজার ৫৭৯ মিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৩৮৫ মিলিয়ন টাকা। টানা লোকসানের মধ্যে এত বড় ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করা কোম্পানিটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে ঋণ পুনঃতফসিল বা নতুন মূলধন সংগ্রহের প্রয়োজন হলে তা বিনিয়োগকারীদের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—লোকসানের মধ্যেই ২০২৫ সালে ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা। বিশ্লেষকদের মতে, এই লভ্যাংশ চলতি বছরের আয় থেকে নয়; বরং আগের রিজার্ভ ও হিসাবগত সুবিধার ওপর নির্ভর করেই দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি কোম্পানির আর্থিক ভিতকে আরও দুর্বল করতে পারে।
এদিকে ২০২৫ সালের এপ্রিলে কোম্পানিটির শেয়ারদর নিয়ে ঘটে যায় আরেক অস্বাভাবিক ঘটনা। মাত্র ১২ কার্যদিবসে শেয়ারের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ১২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে তা ২৪ টাকায় পৌঁছে। একই সময়ে লেনদেনের পরিমাণও ২১ গুণের বেশি বেড়ে যায়। বাজারে গুঞ্জন ওঠে, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে দাম বাড়িয়ে মুনাফা তুলে নিয়েছে।
এই অস্বাভাবিক লেনদেন নিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ তদন্ত করলেও সেই প্রতিবেদনে তিনটি সন্দেহজনক বিও হিসাবের বিস্তারিত ভূমিকা এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ–এ সম্পন্ন কিছু লেনদেনের তথ্য অনুপস্থিত ছিল বলে জানা গেছে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) প্রতিবেদনটিকে অসম্পূর্ণ বিবেচনা করে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। কমিশন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি ও সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়ে কোনো ধরনের গাফিলতি গ্রহণযোগ্য নয়।
সব মিলিয়ে এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন পিএলসির আর্থিক অবস্থার দৃশ্যমান শক্তির বড় অংশই কাগুজে—এমন ধারণাই জোরালো হচ্ছে। টানা লোকসান, ঋণের চাপ, সম্পদ পুনর্মূল্যায়নের ওপর নির্ভরতা এবং অস্বাভাবিক শেয়ারদর উল্লম্ফন কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা—শুধু কাগুজে পরিসংখ্যান নয়, প্রকৃত আর্থিক ভিত্তি যাচাই করেই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
এ ব্যাপারে এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশনের কোম্পানি সেক্রেটারি আলাউদ্দিন শিবলী কোনো যথাযথ ব্যাখা দিতে পারেননি।























