ঢাকা   সোমবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০ ফাল্গুন ১৪৩২

ব্যাংক খাতে ত্রিমুখী সংকট, কঠিন পরীক্ষায় নতুন সরকার

ব্যাংক খাতে ত্রিমুখী সংকট, কঠিন পরীক্ষায় নতুন সরকার

সমস্যায় ভারাক্রান্ত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দায়িত্ব নিয়েছে নবনির্বাচিত সরকার। তবে সামগ্রিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত ব্যাংকিং খাত এখন তিনটি গভীর সংকটে আবদ্ধ—বিপুল খেলাপি ঋণ, দীর্ঘদিনের অর্থপাচার এবং কাঙ্ক্ষিত সুশাসনের অভাব। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এই তিন ইস্যুতে কার্যকর সমাধান ছাড়া অর্থনীতিতে স্থিতি ফেরানো কঠিন হয়ে পড়বে।

সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক–এর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিতরণ করা মোট ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ এখন অনাদায়ী বা অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ঝুঁকিতে।


অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বছরের পর বছর অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা এবং নীতিগত শিথিলতার ফলেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সঠিক যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ অনুমোদন এবং রাজনৈতিক-প্রভাবিত সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাতকে ভঙ্গুর করে তুলেছে বলে তাদের অভিমত।

সাবেক ব্যাংকারদের পরামর্শ, প্রকৃত খেলাপি ঋণের হিসাব নির্ধারণ এবং কার্যকর আদায় নিশ্চিত করতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে কাগুজে প্রতিষ্ঠান বা নামসর্বস্ব কোম্পানিকে ঋণ দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ না করলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।

এদিকে গত দেড় দশকে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচারের অভিযোগও নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থপাচার রোধ ও হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে আনা এখন জরুরি অগ্রাধিকার। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কিছুটা স্থিতি এসেছে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহও বেড়েছে।

ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়—একাধিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, কয়েকটি ব্যাংক একীভূতকরণ এবং বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা প্রদান। পাশাপাশি নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। তবুও প্রত্যাশিত স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ফিরে আসেনি।


ফরাসউদ্দিন আহমেদ, সাবেক গভর্নর, বলেন—ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তার মতে, শৃঙ্খলা ফিরলে ভুয়া ঋণ কমবে, হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে।

তিনি আরও মন্তব্য করেন, খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের জন্য ‘ক্যান্সার’-এর মতো; এ সমস্যার কার্যকর সমাধান ছাড়া সুস্থতা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেন তিনি।

সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিবিদদের অভিমত, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ আদায় এবং অর্থপাচার রোধে কঠোর ও ধারাবাহিক পদক্ষেপই হতে পারে নতুন সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই তিন সংকট মোকাবিলা করা গেলে অর্থনীতিতে আস্থা ও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।