ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ড মার্কেটমুখী করতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যেই সঞ্চয়পত্রকে শেয়ারবাজারে লেনদেনযোগ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
সোমবার রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত ‘বন্ড মার্কেটের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে গভর্নর বলেন, এখন থেকে কোনো ব্যাংকই বড় গ্রাহকদের ক্ষেত্রে একক ঋণসীমা (সিঙ্গেল বরোয়ার লিমিট) অতিক্রম করতে পারবে না। এ বিষয়ে কোনো তদবির বা অন্যায্য চাপ গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।
তিনি জানান, বর্তমানে একটি ব্যাংক তার মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত একক গ্রাহককে ঋণ দিতে পারে, যার মধ্যে ফান্ডেড ঋণের সীমা ১৫ শতাংশ। এই সীমাবদ্ধতার মাধ্যমে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধীরে ধীরে ব্যাংক ঋণনির্ভরতা থেকে বের করে বন্ড মার্কেটে নিয়ে আসাই মূল লক্ষ্য।
গভর্নর আরও বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে বন্ড ও শেয়ারবাজার মূলধন জোগানের প্রধান উৎস হলেও বাংলাদেশে অতিরিক্তভাবে মানি মার্কেট বা ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে, যা একটি কাঠামোগত দুর্বলতা। এই অসামঞ্জস্যতা দূর করতে সরকারকে নেতৃত্ব দিয়ে বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশে ৫ থেকে ৬ লাখ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বাজার রয়েছে, যা সহজেই সেকেন্ডারি মার্কেট বা শেয়ারবাজারে লেনদেনযোগ্য করা সম্ভব। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের বন্ড মার্কেটের আকার রাতারাতি দ্বিগুণ হতে পারে। তবে এজন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো জরুরি—যেন প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো লভ্যাংশসহ অর্থ পরিশোধ করে এবং ব্যর্থ হলে তাদের খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সেমিনারে বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, ব্যাংক থেকে সহজে ও দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকায় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে আসতে আগ্রহী হচ্ছে না, যা খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার জানান, ট্রেজারি বন্ড সেকেন্ডারি মার্কেটে আনতে কিছু করসংক্রান্ত সফটওয়্যার সমস্যার কারণে বিলম্ব হচ্ছে, তবে তা সমাধানে কাজ চলছে। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা বা ‘সিলিং’ তুলে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, এসব উদ্যোগ সফল হলে দেশের আর্থিক খাতে মৌলিক পরিবর্তন আসবে। বন্ড মার্কেট শক্তিশালী হলে বড় করপোরেটদের ঋণের চাপ ব্যাংক থেকে কমবে, বাড়বে বাজারে নগদ প্রবাহ এবং দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারবাজারের গভীরতাও বৃদ্ধি পাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই প্যানেল আলোচনায় আরও অংশ নেন আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, বিএসইসি কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন এবং এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন।
























