ঢাকা   বুধবার ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩২

বদলে যাচ্ছে শেয়ারবাজারে আইপিও শেয়ারের দাম নির্ধারণের নিয়ম

বদলে যাচ্ছে শেয়ারবাজারে আইপিও শেয়ারের দাম নির্ধারণের নিয়ম

স্টেকহোল্ডারদের মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা নতুন পাবলিক ইস্যু রুলস শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মতে, এই বিধিমালার মাধ্যমে আইপিও প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে, শেয়ার দর থাকবে যৌক্তিক পর্যায়ে এবং কার্টেল, কৃত্রিম দর প্রস্তাব ও প্রাইস ম্যানিপুলেশনের সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) পাবলিক ইস্যু রুলস নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম। তিনি জানান, নতুন এই বিধিমালা কোনো একক সিদ্ধান্তের ফল নয়; বরং বাজারসংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়েই এটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আইপিও রুলসের খসড়া প্রকাশের পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১৭০টিসহ মোট ২২০টি মন্তব্য ও প্রস্তাব পাওয়া যায়। কমিশন প্রতিটি মতামত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করেছে এবং সেগুলোর প্রতিফলন চূড়ান্ত বিধিমালায় রাখা হয়েছে। খসড়া ও চূড়ান্ত রুলসের মধ্যে পার্থক্যই প্রমাণ করে যে স্টেকহোল্ডারদের মতামত বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে।

আবুল কালাম আরও জানান, ২০০৬ সাল থেকে আইপিও প্রক্রিয়া নিয়ে যেসব বিষয় বিতর্কিত ছিল—যেমন মেরিট মূল্যায়ন, স্বরেজমিনে পরিদর্শন, স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশ, একটি না দুটি স্টক এক্সচেঞ্জে আইপিও করার বাধ্যবাধকতা—এসব বিষয় নতুন বিধিমালায় পাবলিক ওপিনিয়নের ভিত্তিতে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।

নতুন বিধিমালায় ইচ্ছামতো শেয়ারদর প্রস্তাবের সুযোগ আর থাকছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, সক্ষমতার বাইরে গিয়ে কেউ অতিরিক্ত দর প্রস্তাব করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে দর প্রস্তাবে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত হবে।

২০২০ সালের সংশোধিত পাবলিক ইস্যু রুলসের সমালোচনা করে বিএসইসির মুখপাত্র বলেন, সে সময় যেভাবে দর নির্ধারণ করা হতো, তা প্রকৃত অর্থে বুক বিল্ডিং ছিল না; বরং কার্যত তা ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতির মতোই ছিল। সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এবার কমিশন পুরোপুরি বাজারনির্ভর ও কার্যকর বুক বিল্ডিং পদ্ধতি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়েছে।

তিনি জানান, বিএসইসি গঠিত টাস্কফোর্স তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল—মিউচুয়াল ফান্ড, আইপিও ও মার্জিন রুলস। এই তিন ক্ষেত্রেই সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। কর্পোরেট গভর্ন্যান্স ও অডিটরস প্যানেল সংক্রান্ত বিষয়গুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি।

আবুল কালাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আইপিও প্রক্রিয়ায় কার্টেল গঠন, কৃত্রিম দর প্রস্তাব ও প্রাইস ম্যানিপুলেশনের অভিযোগ উঠে আসছিল। এসব অনিয়ম ঠেকাতে নতুন পাবলিক ইস্যু বিধিমালায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে এবং ফিক্সড প্রাইস নির্ভরতা থেকে সরে এসে বাজারনির্ভর বুক বিল্ডিং ব্যবস্থাকেই মূলধারায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন বিধিমালায় কার্টেল গঠন, কৃত্রিম দর প্রস্তাব ও সক্ষমতার বাইরে গিয়ে দর দেওয়ার মতো কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব অনিয়ম রোধে ছয়টি নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করা হয়েছে এবং নিয়ম ভঙ্গ করলে শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ব্যাখ্যা করা হয়, কার্টেল বলতে একাধিক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর মধ্যে গোপন সমঝোতাকে বোঝায়, যার মাধ্যমে বাজার প্রভাবিত করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো বা কমানো হয় এবং অন্যদের ক্ষতিগ্রস্ত করে নিজেদের লাভ নিশ্চিত করা হয়।

এতে আরও জানানো হয়, অতীতে ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে আইপিওর দাম নির্ধারণ ছিল মূলত দরকষাকষিনির্ভর ও বাজারবিচ্ছিন্ন, যা নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করত। এই ঝুঁকি কমাতেই ২০১৫ সাল থেকে ধাপে ধাপে বুক বিল্ডিং পদ্ধতির দিকে যাত্রা শুরু হয়

নতুন বিধিমালায় ইন্ডিকেটিভ প্রাইস নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ করা হয়েছে। এখন ইস্যুয়ার ও ইস্যু ম্যানেজারকে ভ্যালুয়েশন পদ্ধতির মাধ্যমে ইন্ডিকেটিভ প্রাইসের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হবে। পাশাপাশি রোডশোর মাধ্যমে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও মূল্য-ইচ্ছা যাচাই করে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ চাহিদার ভিত্তিতে সেই দর ভ্যালিডেশন করতে হবে।

এখন শুধু একটি দর প্রস্তাব করলেই হবে না; সেই দামে কত শেয়ার কেনার সক্ষমতা ও বাস্তব আগ্রহ রয়েছে, সেটিও প্রমাণ করতে হবে বলে জানান বিএসইসির মুখপাত্র।

আবুল কালাম বলেন, আইপিও প্রক্রিয়া নিয়ে সাংবাদিক ও বাজার সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরে যে সমস্যাগুলো তুলে ধরেছেন, নতুন এই সংস্কারের মাধ্যমে সেগুলোর সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। কমিশনের বিশ্বাস, এই বিধিমালা বাজারনির্ভর, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য আইপিও ব্যবস্থা গড়ে তুলবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক হাসান মাহমুদ, অতিরিক্ত পরিচালক লুৎফুল কবির এবং যুগ্ম পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা শরিফুল আলম উপস্থিত ছিলেন।