ঢাকা   বুধবার ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২৪ পৌষ ১৪৩২

চুক্তি ও ঋণের জালে বন্দি বিদ্যুৎ খাত: বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বৃদ্ধি

চুক্তি ও ঋণের জালে বন্দি বিদ্যুৎ খাত: বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বৃদ্ধি

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলো এখন শুধু আর্থিক দুর্বলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভবিষ্যৎ টিকে থাকা ও ব্যবসার ধারাবাহিকতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সরকারি ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) মেয়াদ শেষ হওয়া, নতুন চুক্তির অনিশ্চয়তা, উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ থাকা, আদায় অযোগ্য পাওনা এবং সম্পদের অতিমূল্যায়ন—এই সব মিলিয়ে কোম্পানিগুলোর আর্থিক ও পরিচালনাগত পরিস্থিতি সংকটজনক হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক আর্থিক নিরীক্ষা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ১১টি কোম্পানির অন্তত পাঁচটির ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকি স্পষ্ট।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ণ

শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি জানিয়েছে, চুক্তি ও আর্থিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ণ করছে। তাই কোম্পানিগুলোকে সঠিক তথ্য প্রকাশ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ক্রয় চুক্তি ছাড়া বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ টেকসই নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক প্ল্যান্টের উৎপাদন ব্যয় বেশি, গ্যাস সংকট এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। পিপিএ শেষ হওয়া প্ল্যান্ট চালু রাখা কঠিন। অডিট রিপোর্টে ‘গোয়িং কনসার্ন’ ঝুঁকি থাকলে তা বিনিয়োগকারীদের জানানো আবশ্যক।

কোম্পানিভিত্তিক সংকট

পাওয়ার গ্রিড

বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে ৪,৭১৫ কোটি টাকার ফরেন এক্সচেঞ্জ ক্ষতি মূলধনে যুক্ত

২৭,৪৩৬ কোটি টাকার সম্পদ পরীক্ষা ছাড়া দেখানো হয়েছে

বিতর্কিত পাওনায় প্রভিশন রাখা হয়নি

২০২৩ ও ২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি ৮ ও ৫ টাকার বেশি লোকসান

জেড ক্যাটাগরিতে নেমেছে

নির্বাহী পরিচালক মো. মুনিরুজ্জামান জানান, ভেন্ডর চুক্তি সমস্যার সমাধান চলছে এবং প্রয়োজন হলে সুদ ব্যয়ের সমন্বয় করা হবে

ডেসকো

৫৬০ কোটি টাকার পাওনার মধ্যে ৩১১ কোটি অযোগ্য

প্রভিশন রাখা হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা

বাতিল গুলশান সাবস্টেশন প্রকল্প এখনও সিডব্লিউআইপিতে দেখানো হচ্ছে

২০২৩ ও ২০২৪ সালে ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি

কোম্পানি সচিব মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান জানান, বিহারি ক্যাম্পে বিদ্যুৎ সরবরাহের বকেয়া ২৬৩ কোটি টাকার মামলা চলমান

বারাকা পাওয়ার

১৫৫ কোটি টাকার বেশি জামানতহীন ঋণ

ফেঞ্চুগঞ্জ ৫১ মেগাওয়াট রেন্টাল কেন্দ্র চুক্তি শেষ হওয়ায় ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে বন্ধ

সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ হয়নি

খুলনা পাওয়ার

ইউনিট-২ ও ইউনিট-৩-এর পিপিএ ২০২৪ সালে শেষ

আগস্ট থেকে প্ল্যান্ট বন্ধ, সম্পদের মূল্যহ্রাসের ঝুঁকি

টানা পাঁচ বছরের লোকসানের কারণে জেড ক্যাটাগরি

ডরিন পাওয়ার

তিনটি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের পিপিএ শেষ, ভবিষ্যৎ আয় অনিশ্চিত

গ্র্যাচুইটি ও দেনা-পাওনার হিসাব নিয়েও অডিটে প্রশ্ন


ড. ফাহমিদা খাতুন, নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ:

"সরকারি ক্রয় চুক্তির অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অভাব বিদ্যুৎ খাতকে সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চুক্তি পুনর্নবায়ন এবং বাজারমুখী উদ্যোগ ছাড়া উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষা সম্ভব নয়। এতে কোম্পানিগুলো টেকসই হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে।"