আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান ও চার কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বাজারকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করতে কমিশনকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
মঙ্গলবার (০২ জুন) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭ : প্রত্যাশা ও বাস্তবায়ন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে বাছাই করা হয়েছে, যাদের পুঁজিবাজার সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের নেতৃত্বে দেশের ক্যাপিটাল মার্কেটে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তার ভাষায়, “একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হবে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই আপনারা এর বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাবেন।”
তিনি বলেন, অতীতে নানা অনিয়ম ও অনাস্থার কারণে অনেক ভালো কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহ দেখায়নি। তবে বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে এখন অনেক উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “অনেক উদ্যোক্তা এখন বলছেন তারা শেয়ারবাজারে আসতে চান। কারণ তারা ক্যাসিনোতে নয়, একটি প্রকৃত স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হতে চান।”
তার মতে, ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়লে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের চাপ কমবে এবং শেয়ার ও বন্ডের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে।
সিডিবিএল গঠনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন অর্থমন্ত্রী
বক্তব্যে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) প্রতিষ্ঠার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, একসময় শেয়ার সার্টিফিকেট জালিয়াতি, একই শেয়ার একাধিকবার বিক্রি এবং বন্ধক রাখার মতো নানা অনিয়ম বাজারে ছিল। এসব সমস্যা দূর করতেই কাগজভিত্তিক শেয়ার ব্যবস্থার পরিবর্তে ইলেকট্রনিক পদ্ধতি চালু করা হয়।
তিনি জানান, সিডিবিএলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি সরাসরি এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এ জন্য সংসদে আইন পাসসহ বিভিন্ন মহলকে বিষয়টি বোঝাতে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালাতে হয়েছিল।
তার মতে, বর্তমানে অনলাইন ও রিয়েল-টাইম ট্রেডিং চালুর ফলে দেশের শেয়ারবাজার অনেক বেশি আধুনিক, স্বচ্ছ ও কার্যকর হয়েছে।
ব্যাংক খাতের অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগ
দেশের ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে অনেক ব্যাংক এখন মূলধন সংকটে ভুগছে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারীও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ব্যাংকগুলোর পুনঃমূলধনীকরণ এবং বেসরকারি খাতে কার্যকর মূলধনের জোগান নিশ্চিত করা।
সরকারের একার পক্ষে এ কাজ সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি জানান, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ফান্ড ম্যানেজারের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে
অর্থমন্ত্রী জানান, International Finance Corporation (আইএফসি), বিভিন্ন বৈশ্বিক ফান্ড ম্যানেজার এবং বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ সম্ভাবনার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের শীর্ষ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি JPMorgan Chase-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সফর করছে এবং দেশের বাজার নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করছে।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে বাড়বে শেয়ারবাজারের ভূমিকা
ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমাতে শক্তিশালী শেয়ারবাজার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে অনেক ব্যাংক ১২ থেকে ১৩ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
তার মতে, কার্যকর ও গভীর শেয়ারবাজার গড়ে উঠলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বড় অংশ শেয়ার ও বন্ড বাজার থেকেই আসবে। এতে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
দেশে তৈরি হবে বৈদ্যুতিক গাড়ি
অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে এবং সরকার এ খাতের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।
তিনি বলেন, দেশে উৎপাদিত বৈদ্যুতিক গাড়ি শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, বিদেশেও রপ্তানি করা হবে। এর ফলে সাধারণ মানুষ তুলনামূলক কম দামে আধুনিক প্রযুক্তির যানবাহন ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
সবশেষে তিনি বলেন, ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া সহজ নয়। তবে সরকার সেই লক্ষ্য অর্জনে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।






















