Sahre Business Logo
bangla fonts
facebook twitter google plus rss

সেবা নিতে আসা ৮০% শিশুই ছিল ধর্ষণের শিকার


০৯ আগস্ট ২০১৫ রবিবার, ০৩:৫৮  এএম


গত ১৫ বছরে বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়ে সরকারি সেবাকেন্দ্রে আসা নারী ও শিশুর সংখ্যা ২১ হাজারের বেশি। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ শিশু। তাদের ৮০ শতাংশই ধর্ষণের শিকার। বাকি শিশুরা গৃহকর্মী হিসেবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট আটটি সেবাকেন্দ্রে গত জুলাই মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে। এই আটটি কেন্দ্র ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) নামে পরিচিত। নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের এখানে আইনি সুবিধাসহ সমন্বিত সেবা দেওয়া হচ্ছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাল্টিসেক্টরাল প্রকল্পের কার্যক্রমের অধীনে ওসিসি পরিচালিত হচ্ছে। তবে চিকিৎসাসেবার বিষয়টি নিশ্চিত হলেও মামলাগুলো ঠিকমতো নিষ্পত্তি না হওয়ায় অপরাধীর শাস্তি হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের পরিচালক আবুল হোসেন। তিনি বলেন, ধর্ষণের শিকার শিশুর পরিবার প্রাথমিক পর্যায়ে মামলা করতে উৎসাহী হয়। কিন্তু ওসিসি থেকে চিকিৎসা শেষে বাড়ি যাওয়ার পর পারিবারিক ও সামাজিক চাপে মামলা চালানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে যায়। বেশির ভাগ দরিদ্র পরিবার ধর্ষকের পরিবারের সঙ্গে টাকাপয়সার বিনিময়ে আপসরফা করে ফেলে। ধর্ষণসহ শিশুসংক্রান্ত মামলাগুলোর জন্য আলাদা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের সুপারিশ করেন আবুল হোসেন। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম বলছে, চলতি বছরের জুলাই মাসেই ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে ৬৭ শিশু। আর জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত সাত মাসে ধর্ষণ, উত্ত্যক্তসহ যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে ৩৪৭টি শিশু। এর মধ্যে শুধু গণধর্ষণের শিকার ছিল ৬১টি শিশু। ৩৪৭টি শিশুর মধ্যে চারটি ছেলেশিশুও এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয়। শিশু ধর্ষণসহ অন্যান্য যৌন সহিংসতার সংখ্যা বাড়ছে। গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যার সংখ্যাও বেড়েছে। ফোরামের তথ্য বলছে, ২০১২ সালে শিশু ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৮৬। বছরটিতে ধর্ষণের চেষ্টাসহ মোট ৯১ জন এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয়। ২০১৩ সালে ধর্ষণের পর হত্যাসহ সংখ্যাটি গিয়ে দাঁড়ায় ১৮৩। ২০১৪ সালে শুধু গণধর্ষণেরই শিকার হয় ২২টি শিশু। সব মিলে সংখ্যাটি ছিল ২২৭। বিভিন্ন ইংরেজি ও বাংলা জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ২৬৭টি শিশু অধিকার নিয়ে কর্মরত সংগঠনের মোর্চা শিশু অধিকার ফোরাম গত বছরের শিশু ধর্ষণের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, বছরটিতে ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সহিংসতার শিকার শিশুর মধ্যে ১ থেকে ৬ বছর বয়সী ছিল ৫৬টি বা ২৫ শতাংশ। ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৮০টি, অর্থাৎ ৩৫ শতাংশ। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুছ শহিদ মাহমুদ বলেন, শিশু ধর্ষণসহ যেকোনো ঘটনায় কোনো বেসরকারি সংগঠন হয়তো ১০টি সংবাদপত্র বিশ্লেষণ করছে। আবার কোনো সংগঠন পাঁচটি পত্রিকা বিশ্লেষণ করছে। ফলে সংখ্যার তারতম্য ঘটছে। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত সংগঠনগুলো অনলাইনে প্রকাশিত তথ্যগুলো সংরক্ষণ করছে না। এটি করলে সংখ্যার পরিমাণ আরও বাড়বে। এ ক্ষেত্রে সংখ্যা বা পরিসংখ্যানের জটিলতা এড়াতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। একটি তথ্যভান্ডার থাকতে হবে। তাহলে দেশের আসল পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব হবে। শিশুকে যৌন সহিংসতা থেকে সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক রোখসানা সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইদানীং পত্রিকার পাতা খুললেই শিশু ধর্ষণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে দেশে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতার ঘটনা বেশি ঘটে, তখন গণমাধ্যমে এ ধরনের ঘটনাগুলো দেখা যায় না। তখন কি আসলেই ঘটনা ঘটে না? না গণমাধ্যম গুরুত্ব দেয় না? ফলে আসলেই সংখ্যাটি বাড়ছে কি না, তা বিচার-বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। গণমাধ্যমকে সব সময়ই এ ধরনের ঘটনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রচার ও প্রকাশ করতে হবে।’ শিশুর শারীরিক ও মানসিক প্রভাব: শিশু ধর্ষণের সংখ্যার পাশাপাশি ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার পর শিশুর ওপর যে ভয়াবহভাবে শারীরিক ও মানসিক প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিশু অধিকার নিয়ে কর্মরত ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, এই বীভৎস স্মৃতি অনেকে সারা জীবন মনে রাখে। ফলে তারা সামাজিক, পারিবারিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বলতে গেলে শিশু বয়সের ঘটনা তার পুরো জীবনটাকেই পাল্টে ফেলে। নওগাঁর এক আদিবাসী বাবা টেলিফোনে বাংলা ও সাঁওতাল ভাষার মিশেলে যা জানালেন তা হচ্ছে, তাঁর মাত্র তিন বছর বয়সী মেয়েকে ধর্ষণ করেছে মেয়ের আপন ফুফা। ধর্ষণের ঘটনা ঘটে রোজার শুরুর দিকে। মেয়ের শারীরিক অবস্থা এখন একটু ভালো। মেয়ের শারীরিক অবস্থার কথা মুখে বলতেও লজ্জা পাচ্ছিলেন ওই বাবা। তিনি বলেন, ‘মেয়ের শরীরের ক্ষতি হইছে, তাই তো এক মাস পর আবার অপারেশন হবে।’ আর ঘটনার পর মানুষ দেখলেই মেয়ে ভয় পেত বলে জানালেন বাবা। আদিবাসী বাবার নিজের জমি নেই। মানুষের জমিতে কৃষিকাজ করেন। তিনি বলেন, ‘নিজের বলতি আছে, হাত আর পা।’ ঘটনার ১৫ থেকে ১৬ দিন পর পুলিশ আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। এখন আসামি কারাগারে আছে। বোন মামলা তুলে নিতে আদিবাসী ওই ভাইয়ের ওপর চাপ দিচ্ছেন। তবে বাবা বলেন, ‘দুলাভাই না, আমার মেয়ে আগে। খারাপ মানুষ সাজা পাক। আমি বিচার চাই, শাস্তি চাই।’ ৩০ জুলাই রাতে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পথে এক কর্মজীবী কিশোরী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়। রাজধানীর উত্তরায় ওই কিশোরীর এক সহকর্মীসহ কয়েকজন তাকে ধর্ষণ করে। ওই কিশোরীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করা হয়। গত বৃহস্পতিবার ওসিসি থেকে তাকে তার দুলাভাইয়ের বাসায় নেওয়া হয়েছে। গতকাল শনিবার কিশোরীর দুলাভাই বলেন, ‘ঘটনার পর ওর মনের মধ্যে ভয় ঢুকছে। ঘরের ভেতরেই থাকে সারাক্ষণ। জান নিয়া টানাটানি, তাই ও আবার ওর কর্মস্থলে ফিরে যাবে কি না, তা এখনো ঠিক করা হয়নি।’ মামলা আলোর মুখ দেখে না: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ধর্ষণের পর বেশির ভাগ পরিবার মামলা করলেও শেষ পর্যন্ত মামলা লড়তে চায় না। এ ক্ষেত্রে সামাজিক এবং পারিবারিক চাপ থাকে। শিশুরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিচিত জনদের মাধ্যমেই ধর্ষণের শিকার হয়। মেয়েশিশুর ভবিষ্যতে বিয়ে ও অন্যান্য কথা চিন্তা করেও অনেকে মেয়ের ধর্ষণের বিষয়টি চেপে যান। গণমাধ্যমেও যে পরিমাণে শিশু ধর্ষণের খবর প্রকাশিত বা প্রচারিত হয়, সে পরিমাণে ফলোআপ বা কতজন আসামি সাজা পেয়েছে, সে ধরনের সংবাদ কম থাকে। ফলে শিশু অধিকার ফোরাম বা অন্যান্য সংগঠন যারা গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করছে, তাদের কাছে সে ধরনের কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

শেয়ারবিজনেস24.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: