ঢাকা   রোববার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯ ফাল্গুন ১৪৩২

মেঘনা পেট্রোলিয়ামের আর্থিক কেলেঙ্কারি: ১,৮৩৮ কোটি টাকার গরমিল 

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬:৫৯, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ১৭:০২, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মেঘনা পেট্রোলিয়ামের আর্থিক কেলেঙ্কারি: ১,৮৩৮ কোটি টাকার গরমিল 

দেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড—যে কোম্পানির বার্ষিক লেনদেন কয়েক দশ হাজার কোটি টাকার ঘরে—সেই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণীতেই এবার ধরা পড়েছে ভয়াবহ গরমিল। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভ্যাট রিটার্ন ও বিক্রির হিসাবের মধ্যে ১,৮৩৮ কোটি টাকার বেশি অমিল, যা শুধু হিসাবগত ভুল নয়—বরং আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিক্রিতে দুই হিসাব, কোনটা সত্য?

নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মেঘনা পেট্রোলিয়াম তাদের আর্থিক বিবরণীতে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট পণ্য বিক্রি দেখিয়েছে ২৯,৩৪৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। কিন্তু একই সময়ের জন্য সরকারের কাছে জমা দেওয়া ভ্যাট রিটার্নে (মূসক ৯.১) বিক্রির অঙ্ক দেখানো হয়েছে মাত্র ২৭,৫০৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ, দুই সরকারি নথির মধ্যেই বিক্রির হিসাবে ১,৮৩৮ কোটি ১ লাখ টাকার ফারাক।

এই বিশাল পার্থক্য কোনো সামান্য টাইপো বা হিসাবের ভুল বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। কারণ, রাষ্ট্রায়ত্ত একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিক্রির অঙ্কই কর, ভ্যাট, মুনাফা ও সরকারি কোষাগারে জমার ভিত্তি নির্ধারণ করে। তাহলে প্রশ্ন উঠছে—কোন হিসাবটি সঠিক? আর যদি ভ্যাট রিটার্নই সত্য হয়, তাহলে আর্থিক বিবরণীতে অতিরিক্ত ১,৮৩৮ কোটি টাকা কোথা থেকে এলো?

ভ্যাট পাওনাতেও অমিল

শুধু বিক্রির হিসাবেই নয়, ভ্যাট পাওনার ক্ষেত্রেও গরমিলের কথা জানিয়েছে নিরীক্ষকরা। কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে বলা হয়েছে, সরকারের কাছে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ভ্যাট বাবদ পাওনা রয়েছে ৫২ কোটি ৮৯ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অথচ ভ্যাট রিটার্নের সঙ্গে এই অঙ্কের ৩ লাখ ২০ হাজার টাকার পার্থক্য পাওয়া গেছে।

টাকার অঙ্কে এটি তুলনামূলক ছোট মনে হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নথিতে এমন অসামঞ্জস্য আর্থিক শৃঙ্খলা ও রিপোর্টিং মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কারণ, সরকারি হিসাবের ক্ষেত্রে প্রতিটি টাকাই গুরুত্বপূর্ণ।

এফআরসি নির্দেশনা লঙ্ঘনের অভিযোগ

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরেকটি গুরুতর বিষয় উঠে এসেছে—ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)–এর নির্দেশনা লঙ্ঘন। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের হিসাবে শেয়ার মানি ডিপোজিট হিসেবে ১১ কোটি ৬০ লাখ ৬২ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। কিন্তু এফআরসি নির্দেশনা অনুযায়ী, শেয়ার মানি ডিপোজিট গ্রহণের ৬ মাসের মধ্যে তা শেয়ার মূলধনে রূপান্তর করতে হয়।

নিরীক্ষকদের মতে, নির্ধারিত সময় পার হলেও মেঘনা পেট্রোলিয়াম এই রূপান্তর সম্পন্ন করেনি। ফলে এটি কেবল হিসাবগত অনিয়ম নয়, বরং একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষার উদাহরণ।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই গরমিল?

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, মেঘনা পেট্রোলিয়াম কোনো সাধারণ কোম্পানি নয়। এটি রাষ্ট্রের মালিকানাধীন, জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত এবং উচ্চ টার্নওভারভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণীতে যখন হাজার কোটি টাকার গরমিল ধরা পড়ে, তখন তার প্রভাব পড়ে—

বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর

বাজারে কোম্পানির বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর

এবং সর্বোপরি, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে

বিশ্লেষকদের ভাষায়, “রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে হিসাবের স্বচ্ছতা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে ঝুঁকিতে থাকে জনগণের অর্থ।”

মালিকানা কাঠামো ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

২০০৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মেঘনা পেট্রোলিয়ামের পরিশোধিত মূলধন বর্তমানে ১০৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সরকারের হাতে রয়েছে ৫৮.৬৭ শতাংশ শেয়ার। অর্থাৎ, এই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ডের দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়।

সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিক হওয়া সত্ত্বেও এমন বড় অমিল কীভাবে বছরের পর বছর নজরের বাইরে থাকে—সে প্রশ্নও উঠছে। তাহলে কি অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল? নাকি নিরীক্ষা ও তদারকির জায়গায় রয়েছে কাঠামোগত ঘাটতি?

কোম্পানির বক্তব্য কী?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহীরুল হাসান বলেন, অডিট রিপোর্টে উত্থাপিত বিষয়গুলো সত্য, তবে কোম্পানির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা রয়েছে। তবে সেই ব্যাখ্যা কী—তা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

শেষ কথা

সব মিলিয়ে, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী কেবল একটি হিসাবের প্রতিবেদন নয়; এটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা এবং বাজারে আস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
১,৮৩৮ কোটি টাকার এই গরমিলের ব্যাখ্যা যদি দ্রুত ও স্পষ্টভাবে না আসে, তবে তা বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও গভীর উদ্বেগ তৈরি করবে—এমনটাই মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।