Runner Automobiles
Sea Pearl Beach Resort & SPA Ltd
Share Business Logo
bangla fonts
facebook twitter google plus rss

ভিন্নমত

নিয়ন্ত্রণ সংস্থার স্বাধীনতা প্রসঙ্গে কিছু কথা


০৫ ডিসেম্বর ২০১৮ বুধবার, ১১:১৫  পিএম

আবু আহমেদ


নিয়ন্ত্রণ সংস্থার স্বাধীনতা প্রসঙ্গে কিছু কথা

আজকাল সিভিল সোসাইটির অনেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য কমিশন এবং অথরিটিগুলোর স্বায়ত্তশাসন নিয়ে মাথা ঘামান। তাঁরা যেটা বলতে চান তা হলো এসব কমিশন ও অথরিটি যথেষ্ট স্বাধীন নয় যে সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত দেবে বা অবস্থান নেবে। তবে তাঁদের মধ্যে খুব কম লোকই বলেন, আইনে যেটুকু স্বাধীনতা এসব কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে তারা সেটুকুও ব্যবহার করছে না। তারা অনেকটা সরকার যা-ই চায় সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেয়।

প্রত্যেক বাজার অর্থনীতিতে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে রেগুলেট করার জন্য আইন দ্বারা কতগুলো কর্তৃপক্ষ বা কমিশন গঠন করা হয়। ওই সব কমিশন বা কর্তৃপক্ষকে আইন দ্বারা সংজ্ঞায়িত করে যথেষ্ট স্বাধীনতা দেওয়া হয়। স্বাধীনতা দেওয়া হয় কাজের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য এবং যে খাতে ওই সংস্থার কাজকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে সেই খাতে যাতে একটা সমতলভূমি বা ন্যায়ের অবস্থান সৃষ্টি করা হয়। যারা ওই সব খাতের স্টেকহোল্ডারস তাদের মধ্যে যেন পার্থক্য তৈরি না হয় এবং যাতে করে ছোট স্টেকহোল্ডাররা বড় স্টেকহোল্ডারদের কাছে অন্যায়ভাবে পরাজিত না হয়। আমাদের অর্থনীতিতে শেয়ারবাজার, টেলিযোগাযোগ, শক্তি বা এনার্জি বা বিদ্যুৎ-গ্যাস সেক্টরে জনগণের প্রতিনিধি সিলেকশনের ক্ষেত্রে যে কেউ দুর্নীতি করলে তাকে ধরার জন্য এবং আইনের আওতায় আনার জন্য আলাদা আলাদা কমিশন গঠন করা হয়েছে। এসব কমিশনের কাজ হলো স্বাধীনভাবে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সবার জন্য সমতলভূমি এবং ন্যায় সৃষ্টি করা।

বাজার অর্থনীতিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপরীত পক্ষ থাকে সরকার। সরকার কিছু ক্ষেত্রে একচেটিয়া ব্যবসা করে। যেমন—বিদ্যুৎ-গ্যাসের ক্ষেত্রে। কিন্তু এসব ইউটিলিটির (utilities) ক্রেতারা হলো সাধারণ ভোক্তা এবং অন্য যারা সেবা ও পণ্য উৎপাদন করছে। যখন একক উৎপাদনকারী বা সরবরাহকারী হয় তখন তাকে অর্থনীতিতে বলা হয় মনোপলি (monopoly)| এ ক্ষেত্রে ভোক্তা বা দুর্বল পক্ষ যাতে শোষিত না হয় সে জন্য স্বাধীন কমিশন কর্তৃক রেগুলেশনটা আরো বেশি প্রয়োজন হয়। অন্যত্র ব্যক্তি খাত বনাম ব্যক্তি খাত প্রতিযোগিতায় থাকে। তবে সেসব ক্ষেত্রেও এক পক্ষ থাকে বিক্রেতা অন্য পক্ষ থাকে ক্রেতা। যেমন—শেয়ারবাজারের ক্ষেত্রে যারা পুঁজি তুলতে চায় তারা হলো ক্যাপিটাল বা পুঁজির বিক্রেতা আর সাধারণ লোকেরা যারা ব্যবসায় পুঁজি জোগান দিয়ে লাভের অংশীদার হতে চায় তারা হলো ওই পুঁজি ক্রেতা। ক্রেতারা শেয়ার নামের একটা কাগজ কিনে উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীকে পুঁজি সরবরাহ করে। কিন্তু সমস্যা হলো উদ্যোক্তা কৌশলে অন্য কিছু প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সহায়তা নিয়ে বিক্রীতব্য পুঁজিকে অতি মূল্যায়ন করে আনতে পারে বা উদ্যোক্তা একরাশ মিথ্যা তথ্য দিয়ে জনগণ থেকে বেশি অর্থ নিতে পারে। জনগণ বা ছোট উদ্যোক্তারা যাতে প্রতারিত না হয় সে জন্য আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন কর্তৃপক্ষ বাজার থেকে পুরো পুঁজি উত্তোলনের বিষয়টি দেখে। আর সেই কর্তৃপক্ষের নাম হলো বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC)| অবশ্য এই কমিশনের আরো অনেক কাজ আছে। এই কমিশনকে জনস্বার্থে অনেক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আর বিদ্যুৎ-গ্যাস খাতের উৎপাদন ও বিপণনের বিষয়গুলো দেখার জন্য স্বাধীন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) গঠন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কমিশনের মূল কাজ হলো জনস্বার্থ রক্ষা করা। কমিশন জনস্বার্থে যাতে অবস্থান নিতে পারে সে ক্ষমতা এই কমিশনকে দেওয়া হয়েছে। টেলিযোগাযোগ ক্ষেত্রে অনুরূপভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে BTRC। টেলিফোনের বাজার হলো অলিগোপলি ধরনের (oligopoly), মানে কয়েকটি ফার্মের বা প্রতিষ্ঠানের বাজার। মনোপলি এবং অলিগোপলিতে বাজার অনেকটা সেলার্স মার্কেট বা বিক্রেতার বাজার হয়ে দাঁড়ায়। মনোপলি বা অলিগোপলিতে যে মূল্য হাঁকানো হয় সে মূল্য দিতেই বাধ্য হয় ক্রেতা। ক্রেতারা এই সেবা কেনার ক্ষেত্রে যাতে শোষিত না হয় সেটা দেখে BTRC নামের কমিশন। তবে অলিগোপলিতে অন্য কম্পানি একই পরিমাণের ব্যবসা করবে এমন নয়। এ খাতেও কোনো কম্পানি অন্য কম্পানির থেকে শুধু দক্ষতার কারণে এগিয়ে থাকতে পারে। কমিশন সব অলিগোপলিকে সমান করতে চায় না এবং সে প্রচেষ্টা সঠিকও নয়। সারা বিশ্বে

e-commerce-এর ক্ষেত্রে অনেক অনেক করপোরেশন আছে। কিন্তু তারা কি amazon.com হতে পেরেছে? এটা সম্ভব হবে না। তবে amazon.com এর ব্যবসাও স্বাধীন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়। কোনো কম্পানি বা ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের গ্রোথকে (growth) নিয়ন্ত্রক সংস্থা কখনো পেছনে টেনে ধরে না। তারা যেটা দেখে সেটা হলো, কোনো কম্পানি কি এমন কদর্য (dirty) পদক্ষেপ নিচ্ছে যে অন্যরা প্রতিযোগিতা থেকেই সরে যায়।

ব্যাংকিং ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আছে স্বাধীন বাংলাদেশ ব্যাংক। এখানে জনস্বার্থ হলো আমানতকারীদের স্বার্থ। আর এই স্বার্থ রক্ষার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে আইন দ্বারা অনেক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের ক্ষেত্রে অন্য শক্তিশালী পক্ষ হলো ব্যাংকের উদ্যোক্তা-মালিকরা, যারা ঋণ নেয় বা ঋণ ক্রয় করে তারা। বস্তুত এদের কাজকে নিয়ন্ত্রণ করাই বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল কাজ। বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালুর জন্য অনুমতিপত্র দেয়। কত টাকার পুঁজি লাগবে এ ব্যবসা শুরু করতে তাও বলে দেয়। কোনো ব্যাংকের কর্তৃপক্ষ যদি জনস্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে, তাহলে ওই ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে সরিয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে এবং স্থিতিপত্রে যেসব বিষয় অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে ওই সব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও পরিষ্কারভাবে দিকনির্দেশনা দেয়।

আর্থিক নীতি তথা মানিটরি পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই ব্যাংকের একচ্ছত্র ক্ষমতা আছে। আইনে এত ক্ষমতা দেওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের ব্যাংক খাত যদি মানসম্পন্ন স্তরে পরিচালিত না হয়, তাহলে সেটা এই কর্তৃপক্ষের পূর্ণ ব্যর্থতা। কোনো সংস্থাকে শুধু স্বাধীনতা দিলেই হলো না, যেসব লোককে ওই সব সংস্থার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় তারা যদি স্বাধীন থাকতে না চায় বা স্বাধীনভাবে কাজগুলো করতে না চায়, তাহলে এসব সংস্থা বা কর্তৃপক্ষকে যত ক্ষমতাই দেওয়া হোক না কেন তারা স্বাধীনভাবে রেগুলেট করতে পারবে না। এই লোকগুলো এতই দুর্বল যে তারা সব সময় সরকারের উচ্চপর্যায়ের দিকে দিকনির্দেশনার জন্য চেয়ে বসে থাকবে। এ জন্য বলা হয় সংস্থা বা কমিশনকে স্বাধীনতা দিলেই হবে না, যাদের পদায়ন করা হয় তারা ওই স্বাধীনতাকে জনস্বার্থে ব্যবহার করার জন্য উপযুক্ত কি না সেটা আগেই যাচাই করা দরকার। একমাত্র স্বাধীন মনোভাবের লোকেরা স্বাধীন কমিশন বা কর্তৃপক্ষের ওপর পদগুলোতে বসার যোগ্যতা রাখে। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এবং অন্তত তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে কংগ্রেস বা আইনসভায় শুনানি হয়। দেখা হয় যাকে ওই পদে বসানো হচ্ছে সে অন্যান্য ক্ষেত্রে এবং স্বাধীন মনোভাব পোষণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট যোগ্য কি না। শুধু রুটিনমাফিক কাজ করতে যারা অভ্যস্ত তারা কমিশন বা কর্তৃপক্ষের প্রধান হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। যারা ওই সব পদে বসে অনবরত জনস্বার্থে লড়াই করবে তারাই ওই সব পদের যোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে কেউ কেউ আর্থিক নীতির ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন যতই অর্থকে বা ইউএস ডলারকে সস্তা করতে বলছে তারা সেটা শুনতে নারাজ। একই অবস্থা দেখা যায় ভারতীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ক্ষেত্রেও। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার গভর্নরের সঙ্গে ভারত সরকারের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। মূল কারণ হলো, রিজার্ভ ব্যাংক ভারতের সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ারবিজনেস24.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: