ঢাকা   মঙ্গলবার ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকটে চাপে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:৫৯, ২ জুন ২০২৬

সর্বশেষ

প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকটে চাপে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক

আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে বড় ধরনের আর্থিক দুর্বলতা, প্রভিশন ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রক বিচ্যুতির তথ্য উঠে এসেছে। ব্যাংকটির নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান K.M. Alam & Co. Chartered Accountants তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিভিন্ন খাতে ব্যাংকটির মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৯৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটার’ অংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদনের কারণে এই বিশাল ঘাটতির স্বীকৃতি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। ফলে ব্যাংকটি কাগজে-কলমে মুনাফা দেখাতে সক্ষম হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিনিয়োগ, অফ-ব্যালেন্স শিট আইটেম, অন্যান্য সম্পদ, নন-ব্যাংকিং সম্পদ, অন্যান্য ব্যাংকে স্থাপিত অর্থ এবং গ্র্যাচুইটি দায়ের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের তুলনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বহিঃনিরীক্ষক ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা গেছে বিনিয়োগ ও অফ-ব্যালেন্স শিট আইটেমে। এ খাতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল ৬ হাজার ৯৮৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। কিন্তু ব্যাংকটি সংরক্ষণ করেছে মাত্র ১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। ফলে এ খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৯৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

একই সঙ্গে ব্যাংকটির নন-পারফর্মিং ইনভেস্টমেন্ট (এনপিআই) অনুপাত বেড়ে ১৭ দশমিক ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ অবস্থায় চলতি বছরের জন্য কোনো লভ্যাংশ বিতরণের সুযোগ নেই।

নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত বিনিয়োগ আরও ১ হাজার ৯৭১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বেড়েছে। যদিও একই সময়ে ৫২৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে, তবুও পর্যাপ্ত মুনাফা না থাকায় প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকটি মোট বিনিয়োগের ১৬ শতাংশের বেশি পুনঃতফসিল করেছে। যদিও এটি নিয়ন্ত্রক নীতিমালার আওতায় করা হয়েছে, তবে দীর্ঘ গ্রেস পিরিয়ড ও আদায় বিলম্বের কারণে নগদ প্রবাহ ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন নিরীক্ষকরা। একই সঙ্গে এতে প্রকৃত ঋণঝুঁকি আড়াল হওয়ার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে ১৫৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা প্রভিশন প্রয়োজন হলেও ব্যাংকটি সংরক্ষণ করেছে মাত্র ৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। নন-ব্যাংকিং সম্পদের বিপরীতে ৩ কোটি ১ লাখ টাকা এবং তারল্য সংকটে থাকা অন্যান্য ব্যাংকে স্থাপিত অর্থের বিপরীতে ২০৬ কোটি ১৯ লাখ টাকার কোনো প্রভিশন রাখা হয়নি।

গ্র্যাচুইটি দায় ছিল ৪২৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, কিন্তু সংশ্লিষ্ট তহবিলে জমা রয়েছে ৩৪২ কোটি টাকা। ফলে এসব খাত মিলিয়ে অতিরিক্ত ৩৯৪ কোটি ৬১ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল জারি করা এক চিঠির মাধ্যমে মোট ৫ হাজার ৩৯৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতি আপাতত স্বীকৃতি না দেওয়ার অনুমতি দেয়। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকটির আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করা হয়েছে।

তবে নিরীক্ষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এভাবে আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত হলেও এতে ব্যাংকের প্রকৃত ঋণঝুঁকি ও সম্ভাব্য ক্ষতির পুরো চিত্র প্রতিফলিত হয়নি।

ব্যাংকটি ২০২৫ সালে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা দেখিয়েছে ৮৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা। কিন্তু প্রয়োজনীয় সব প্রভিশন সংরক্ষণ করা হলে কর-পরবর্তী লোকসান দাঁড়াত ৫ হাজার ৩০৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা এবং মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) নেতিবাচক হয়ে যেত।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ব্যাংকটি ‘প্রফিট রেন্ট সাসপেন্স’ হিসাব থেকে আদায় ছাড়াই ২০ কোটি টাকা আয় হিসেবে দেখিয়েছে। পাশাপাশি আয়করের বিপরীতে প্রয়োজনীয় ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকার সংরক্ষণও করা হয়নি। ফলে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা প্রকৃত হিসাবের তুলনায় ৪১ কোটি ৪০ লাখ টাকা বেশি দেখানো হয়েছে।

মূলধন পর্যাপ্ততা সংক্রান্ত তথ্যে দেখা যায়, ব্যাংকটির সিআরএআর দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫০ শতাংশের চেয়ে কম। ফলে এ খাতে ঘাটতি রয়েছে ৬৮৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। তবে প্রভিশন ঘাটতির পুরো অঙ্ক বিবেচনায় নিলে মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেতিবাচক হয়ে যায়।

ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান AIB Capital Market Services Limited-এর ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রভিশন ঘাটতির তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগের বাজারমূল্য ১৪২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা কমে গেলেও সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।

এর মধ্যে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের অংশ ৫৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, কারণ প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যাংকের মালিকানা ৬০ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন-এর বিশেষ অনুমোদনের কারণে এই প্রভিশন ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে, প্রতিবেদনের ‘অদার ম্যাটার’ অংশে নিরীক্ষকরা উল্লেখ করেছেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্পন্সর ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে পরিশোধিত মূলধনের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বিধান থাকলেও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ, যা নিয়ন্ত্রক নির্দেশনার তুলনায় অনেক কম।

সর্বশেষ