Nahee Aluminum
Share Business Logo
bangla fonts
facebook twitter google plus rss

ফুটো বাক্সে আরো অধিক অর্থ রেখে লাভ কী?


২০ এপ্রিল ২০১৭ বৃহস্পতিবার, ১১:১৬  এএম

আবু আহমেদ

শেয়ার বিজনেস24.কম


ফুটো বাক্সে আরো অধিক অর্থ রেখে লাভ কী?

ফুটো বাক্সে কেউ অর্থ রাখে না। রাখলে তাকে পাগল বলা হবে অথবা জ্ঞানের তলানির লোক মনে করবে সবাই। তবে অর্থ যদি জনগণের হয়, তাহলে যিনি রাখছেন, তার কাছে সে অর্থের তেমন মূল্য না-ও থাকতে পারে। কথায় বলে, আপন অর্থ দেখেশুনে রাখো, পরের অর্থ দরিয়াতে ফেললে ফেলো। সংবাদ মাধ্যমে খবর বের হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো চরম অর্থ সংকটে ভুগছে। তাদের ব্যবসার এমনই হাল যে, শেষ পর্যন্ত জনগণের দেয় মূলধনটুকুও তারা বরবাদ করে ফেলেছে। এখন চলার জন্য সরকার তথা জনগণ থেকে আবারো মূলধন চাইছে। সরকার অর্থ না দিলে তাদের ব্যাংকিং নামের দোকানগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অথবা এমনও অবস্থা হতে পারে যে, মূলধন তো গেলই, এবার মানুষের আমানতের ওপর হাত দিতে হবে। তখন কী হবে! তখন তো সরকার তথা জনগণকেই সে অর্থ পূরণ করে দিতে হবে। তাই সরকার মনে করছে, আগেভাগেই এসব ব্যাংককে বাইরে থেকে কিছু রক্ত দিয়ে যদি এগুলোকে সচল রাখা যায়।

যেসব রোগীর কিডনি বিকল হয়ে যায়, তারা কি বহুদিন বাঁচে? রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন সংকট তো শেষ হওয়ার নয়। এই তো সরকার বেশকিছু মূলধন দিল, তিন বছর পর দেখা গেল সেটাও শেষ! এভাবেই তো আমরা মূলধন পুনর্ভরণের কাহিনী শুনে আসছি অন্তত পাঁচ বছর থেকে। ওইসব ব্যাংক সরকারকে বলছে, এবার ৩ হাজার কোটি টাকা দাও, সামনে আর লাগবে না। ৩ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার জন্য দস্তুরমতো সুন্দর কথাবার্তায় একটি ওয়ার্কপ্ল্যানও পেশ করা হয়েছে। সরকার ওয়ার্কপ্ল্যান দেখে সন্তুষ্ট হয়ে বলে দিল, ৩ হাজার কোটি দেয়া যাবে না, অত টাকা নেই।

তবে দেড় হাজার কোটি টাকার কথা ভাবা হচ্ছে। সংবাদকর্মীরা জানলেন, সরকার আবারো এসব মূলধনখেকো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে কথিত জনস্বার্থে মূলধন পুনর্ভরণ করতে যাচ্ছে। এখানে সেখানে দু-একটি কথা হচ্ছে, ওই অর্থ দিতে হবে কেন? কমার্শিয়াল কমার্স করেই তো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর লাভ করার কথা, তাহলে আবার ট্যাক্সপেয়ারদের অর্থ দিয়ে তাদের লালন করা কেন? কিন্তু এ মৃদু সমালোচনা সরকার গায়ে মাখে না। সরকারের কাছে মনে হয়, এসব নরম কথা গ্রাহ্য না করলেও চলবে। ব্যাংকগুলোর ওয়ার্কপ্ল্যান, মন্ত্রণালয়ের মতামত এসব পক্ষে থাকলে ঘাটতি মূলধন পূরণ করা যায়। এভাবেই ঘাটতি পূরণ করে যাচ্ছে সরকার প্রায় প্রতিটি বাজেটের মাধ্যমে। জানি না, কথিত রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূলধনের চাহিদা আদৌ কোনো দিন শেষ হবে কিনা! তবে আমার ভাবনা হলো, মূলধন ঘাটতি পূরণের সে চাহিদা কোনো দিনই শেষ হবে না। যেখানে চাইলেই পাওয়া যায়, সেখানে সেই চাওয়ার শেষ হয় না। এটাই নিয়ম। আচ্ছা, এসব কথিত বাণিজ্যিক ব্যাংককে মূলধন ঘাটতির জন্য আরো অধিক অর্থ না দিলে কী হবে? এগুলো মরে যাবে, তাদের ব্যাংকিং নামের দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। তাতে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি কী? ক্ষতি যদি হয়ও, সেই ক্ষতি কি বছর বছর কয়েক হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পূরণের পরিমাণ থেকে বেশি হবে? এখন তো দেশে আরো ৫৪টি বাণিজ্যিক ব্যাংক আছে। এগুলো তো কখনো সরকার থেকে একটি পয়সাও চায়নি। বাস্তবতা হলো, সেগুলোর অনেকগুলোতেই মূলধনের আধিক্য আছে এবং সেগুলো তাদের মালিক তথা জনগণকে অনেক মুনাফা দিচ্ছে এবং সরকারকেও বিশাল অংকের ট্যাক্স দিচ্ছে। এত ব্যাংক থাকতে দু-একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে মরতে দিলে অর্থনীতির কোনো ক্ষতি হবে না। যেসব ব্যবসা অনবরত মূলধন হারায়, ওইসব ব্যবসা শেষ পর্যন্ত চলে কি? চলে না। একে কার্যত বন্ধ করে মালিক বিনিয়োগকৃত মূলধনের যেটুকু রক্ষা করা সম্ভব হয়, সেটুকু রক্ষা করে।

ওই ব্যবসার জায়গায় দেখা গেল অন্য ব্যবসা গড়ে উঠছে। মানুষের উদ্যম কোথাও শূন্যতা থাকতে দেয় না। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মালিক হলো সরকার তথা ওই জনগণ, যারা সরকারকে ট্যাক্স দিচ্ছে। তাহলে যে ব্যবসা চলছে না, সেই ব্যবসাকে জোর করে চালানো কেন? এই যদি হয়, তাহলে পাবলিক অ্যাকাউন্টসে ঘাটতি হবে। তবে ব্যক্তির অ্যাকাউন্টসে উদ্বৃত্ত হবে। এর অর্থ হলো, যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করতে গিয়ে মূলধন হারিয়ে ফেলে, সেই মূলধন ঘাটতির হিসাবটা ধরা দেবে মালিকের, এখানে সরকারের অ্যাকাউন্টসে; আর সেই অর্থ যাদের হাতে গেল, তাদের হিসাব হবে উদ্বৃত্ত। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি কেন বাড়ছে? উত্তর হলো, তারা ঋণ প্রদানের ব্যবসা করতে গিয়ে দেয় ঋণ ফেরত আনতে সক্ষম হচ্ছে না। ব্যাংক ব্যবসা করে অন্যের আমানতের অর্থ দিয়ে। যখন দেয় ঋণ ফেরত আসে না, তখন ঘাটতি পূরণ করতে হয় মূলধন থেকে। সেটাও যদি না কুলোয়, তখন আমানতকারীর আমানতে হাত পড়ে। কারণ ব্যাংকিং নামের ব্যবসায় চলতি ব্যয় বলতে একটা বিষয় আছে। এমনকি এমডি, অফিসার, পিয়ন সবারই বেতন-ভাতা আছে। এখন ব্যবসা করতে গিয়ে যদি এই বেতন-ভাতা বাবদ চলতি দায় মেটানো না যায়, তাহলে তো ওই ব্যবসায় বলতে গেলে মূলধনে হাত দিতে হবে। মূলধন শেষ হয়ে গেলে আমানতের ওপর হাত পড়বে। তাই তো সরকারকে এত বিচলিত দেখা যায়। যেই শোনা গেল, মূলধনের ঘাটতি হয়ে গেছে, অমনি সরকার চিন্তিত হয়ে পড়ে। তবে ব্যাংকারদের এভাবে দায়হীন সহজ ব্যবসা করতে দিলে তাদের ব্যবসা এমনই খারাপ চলবে। তাদের ভাবনায় এসে গেছে, টাকা লাগবে তো দেবে গৌরী সেন। গৌরী সেনের ব্যাগটা যদি সবসময় তাদের জন্য খোলা থাকে, তাহলে তারা ব্যাংকিং করার স্থলে ঋণ বিতরণে ফায়দার দিকেই নজর দেবে বেশি।

সংবাদ মাধ্যম খবর দিয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি চরমে। ১৫ হাজার কোটি টাকা দিতে হবে। হিউজ অ্যামাউন্ট। ভাবুন, এ অর্থ দিয়ে কয়টা স্কুল, কয়টা হাসপাতাল, কয়টা সেতু করা যেত। আবার সংবাদ মাধ্যম এও বলছে, বেসিক ব্যাংকের বিষয়টা নাকি আলাদা, ওই ব্যাংককে কিছু বেশি মূলধন দিতে হবে। কারণ ওই ব্যাংকে বড় রকমের মূলধন ঘাটতি হয়ে গেছে। এ ব্যাংক তো ভালোই ছিল, কেন এত বড় মূলধন ঘাটতি হলো?

ভাগ্যিস, আজকের দিনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অধীনে আমাদের ব্যাংকিং বাজারের ২০ শতাংশের বেশি নেই। যদি থাকত, তাহলে সেসব ব্যাংক যেভাবে লুটিয়ে পড়ছে, অর্থনীতিও সেভাবে হাঁটু ভেঙে পড়ে থাকত। একটা প্রশ্ন সাধারণ লোকেরা করে, সেটা হলো— ওই ব্যাংকগুলো যে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ দিচ্ছে, সেই ঋণের অর্থ তো কোথাও না কোথাও জমা হচ্ছে, অথবা সেই ঋণ কি কোনো রকমের অর্থনৈতিক কাজ না করে বসে আছে? না, বসে নেই। তবে ঋণের একটা অংশ ব্যক্তির পকেটের মাধ্যমে বিদেশে চলে যেতে পারে। বিদেশে না গেলে পুরো ঋণের অর্থ অন্য ব্যাংকে ডিপোজিট হিসেবে জমা পড়েছে। এর অর্থ হলো, তাদের ঋণ বিতরণের ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট কু-ঋণে ক্রমে ভারী হয়ে উঠছে, আর সেই ঋণ অন্য বেসরকারি ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে ডিপোজিট হিসেবে রিজার্ভ হচ্ছে। এর অন্য অর্থ হলো, সরকার নতুন করে মূলধনের জোগান দিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে, আর সেই মূলধন বাজারের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে গিয়ে পড়ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর হিসাবপত্রে। এটা হলো কুমির ও শৃগালের ইক্ষু ভাগাভাগির মতো অথবা দুই ভাই কর্তৃক এক গাভীকে খাওয়ানো এবং দুধ ভাগাভাগির মতো। যে ভাই গাভীর সম্মুখভাগ নিল, সেই ভাই গাভীকে খাওয়াচ্ছে আর যে ভাই গাভীর পেছনের অংশ নিল, সে এই গাভীর দুধ দোহন করছে। সরকার দিচ্ছে অর্থ আর দুধ দোহন করছে ওইসব ব্যাংকের কিছু লোক। দুধের মাখন খাচ্ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। চমত্কার!

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো হয়ে পড়ছে উত্তম এক ট্রান্সফার ইনস্ট্রুমেন্ট। আজ কিছু না করেও দেশে এত ধনী লোকের সৃষ্টি হয়েছে, এদের এক বিরাট অংশ শুধু ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দিয়ে ধনী হয়েছে। এদের ঋণ দিতে অনেক ব্যাংকার অনেক আগ্রহী। এটার কারণ আছে। যাদের ঋণ দিচ্ছে, তারা তা দিয়ে ট্যুরে যায়। এরা অনেকটা খায়। কিছুটা বিলায়। ঋণ নিয়ে ঋণ ফেরত না দেয়াও একটি ব্যবসা! অতি চমত্কার ঋণের কাগজপত্র, এমডি সাহেব সন্তুষ্ট। বোর্ড সন্তুষ্ট, সুতরাং ঋণ মঞ্জুর। যে যা-ই বলুক, ব্যাংক মানেই তো ঋণের ব্যবসা! ঋণের ব্যবসা না করলে ব্যাংকে এত এত লোক কী করবে। এ ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া তো ব্যাংকই বন্ধ হয়ে যাওয়া। তাই আবার মূলধন সংগ্রহ করো, দরকার হলে বন্ড ইস্যু করো, তবু ব্যাংকিং ব্যবসা চালিয়ে যাও। আর কু-ঋণের বিষয়টা সরকার এতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখবে না। কারণ হলো, কুঋণের ফিরিস্তি পড়ার মতো সরকারের এত সময় নেই। আর জনগণ তো কোনো ব্যাপারেই প্রতিবাদ করে না। জনগণ ট্যাক্স দেয়, কারণ তাদের দিতে বলা হয়। তাদের এত চিন্তা করতে হবে কেন যে, ট্যাক্সের অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে। অনেক মেমোরেন্ডাম ওইসব মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের সঙ্গে সই হয়েছে। তাদের অনেকের স্বাস্থ্যকে ভালো করার জন্য অনেক বছর আগে বিশ্বব্যাংক থেকেও ঋণ নেয়া হয়েছিল। এমডির বেতন অনেক বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো কাজ হয়েছিল কি? হয়নি। আসলে সরকার মালিক থাকলে যা হয়!

লেখক: অর্থনীতিবিদ

শেয়ারবিজনেস24.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: